মেছতা কেন হয়? কারণ, ধরন, লক্ষণ ও প্রতিরোধের সম্পূর্ণ গাইডলাইন
মুখে হঠাৎ বাদামী বা ধূসর রঙের ছোপ দেখা দিলে অনেকেই এটিকে সাধারণ দাগ ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু সময়ের সাথে যখন দাগগুলো গাঢ় হতে থাকে, তখন মনে হয় “আরে এটা তো মেছতা” আর মনে প্রশ্ন আসে—মেছতা কেন হয়?
বর্তমানে মেছতা (Melasma) এবং হাইপার-পিগমেন্টেশন (Hyperpigmentation) অন্যতম সাধারণ সমস্যাগুলোর একটি। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়। মেছতা কেন হয়—এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, হরমোনের পরিবর্তন, বংশগত কারণ, অতিরিক্ত তাপ এবং ত্বকে অতিরিক্ত মেলানিন উৎপাদনের বিষয়গুলো বুঝতে হবে।
এই ব্লগে আপনি জানতে পারবেন
- মেছতা কী?
- মেছতার হওয়ার কারণ
- মেছতার বিভিন্ন ধরন
- মেছতায় কারা বেশি আক্রান্ত হয়?
- মেছতা কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়?
মেছতা (Melasma) কী? মুখে মেছতা কেন হয়?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, মেছতা হলো এক ধরণের হাইপার-পিগমেন্টেশন (Hyperpigmentation)। আমাদের ত্বকে ‘মেলানিন’ নামক একটি উপাদান থাকে, যা আমাদের স্কিন টোন ব্যালেন্স করে। কোনো কারণে ত্বকের নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় মেলানিন উৎপাদন বেড়ে গেলে মুখে কালো ছোপ ছোপ দাগ হয় আর এই ছোপ ছোপ দাগ গুলোই আসলে মেছতা ।
মেছতায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়—
- দুই গাল
- কপাল
- নাকের উপরিভাগ
- উপরের ঠোঁটের অংশ
- চিবুক
এছাড়াও
- গলার চারপাশ
- ঘাড়
- বুকের উপরিভাগ
- উপরি বাহু
- কাঁধ
- অগ্রবাহু বা হাত
মেছতা কেন হয়? (Melasma Causes)
মেছতা কেন হয়? সাধারণত সূর্যের অতিবেগুনি (UV) রশ্মি, হরমোনের পরিবর্তন, বংশগত বৈশিষ্ট্য, অতিরিক্ত তাপ, কিছু ওষুধ এবং অনুপযুক্ত স্কিন কেয়ারের কারণে ত্বকে অতিরিক্ত মেলানিন তৈরি হয়। এর ফলেই মুখে বাদামী বা ধূসর রঙের ছোপ দেখা দিতে পারে, যাকে Melasma বা মেছতা বলা হয়।
১. সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি (UV Rays)
এটি মেছতার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি।
যখন আমরা দীর্ঘ সময় সূর্যের আলোতে থাকি, তখন সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি (UV Rays) ত্বকের মেলানোসাইট (Melanocyte) কোষকে বেশি মেলানিন (Melanin) উৎপাদনে উদ্দীপিত করে।
ফলে—
- পুরনো মেছতা আরও গাঢ় হয়
- নতুন মেছতা তৈরি হতে পারে
- চিকিৎসার পরও আবার ফিরে আসতে পারে
এ কারণেই ডার্মাটোলজিস্ট (Dermatologist)-রা মেছতা রোগীদের নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেন।
২. হরমোনের পরিবর্তন
হরমোন মেছতার অন্যতম বড় কারণ।
বিশেষ করে—
- প্রেগন্যান্সি (Pregnancy)
- বার্থ কন্ট্রোল পিলস (Birth Control Pills)
- হরমোন থেরাপি (Hormone Therapy)
- মেনোপজ (Menopause)-এর সময়
ইস্ট্রোজেন (Estrogen) এবং প্রোজেস্টেরন (Progesterone)-এর পরিবর্তনের কারণে মেলানিন উৎপাদন বেড়ে যেতে পারে।
এ কারণেই অনেক নারী গর্ভাবস্থার পর মুখে মেছতা লক্ষ্য করেন।
৩. বংশগত কারণ
পরিবারের কারও যদি মেছতা থাকে, তাহলে আপনার ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
যদিও এটি সরাসরি সংক্রামক নয়, তবে জেনেটিক প্রিডিসপোজিশন (Genetic Predisposition) একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৪. অতিরিক্ত তাপ
অনেকে মনে করেন শুধুমাত্র সূর্যের আলোই দায়ী।
কিন্তু—
- রান্নাঘরের চুলার তাপ
- ওভেনের তাপ
- অতিরিক্ত গরম পরিবেশ
এগুলোও মেছতা বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের আবহাওয়ায় এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
৫. কিছু কসমেটিকস ও স্কিন কেয়ার পণ্য
সব ধরনের স্কিন কেয়ার পণ্য সবার জন্য উপযুক্ত নয়।
যদি কোনো পণ্য—
- ত্বকে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করে
- স্কিন ব্যারিয়ার (Skin Barrier) দুর্বল করে
- Irritation তৈরি করে
তাহলে দীর্ঘমেয়াদে পিগমেন্টেশন (Pigmentation) বেড়ে যেতে পারে।
৬. থাইরয়েডের সমস্যা
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু মেছতা রোগীর মধ্যে থাইরয়েড ডিসঅর্ডার (Thyroid Disorder) এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
যদিও এটি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, তবে চিকিৎসক প্রয়োজনে পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
মেছতার ধরন, লক্ষণ, ঝুঁকির কারণ
মেছতার ধরন (Types of Melasma)
মেছতা বা Melasma সবার ক্ষেত্রে একই রকম হয় না। কারও ক্ষেত্রে এটি হালকা বাদামী দাগ হিসেবে শুরু হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে গাঢ় বাদামী বা ধূসর-বাদামী ছোপে পরিণত হয়। দাগের গভীরতা, অবস্থান এবং ত্বকের কোন স্তরে অতিরিক্ত মেলানিন জমেছে তার ওপর ভিত্তি করে মেছতার ধরন নির্ধারণ করা হয়। মেছতার টাইপ জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চিকিৎসা ও ফলাফল অনেকাংশে টাইপের ওপর নির্ভর করে।
মেছতার প্রধান ৩টি ধরন
১. এপিডার্মাল মেলাজমা (Epidermal Melasma)
এটি সবচেয়ে কমন মেছতা।
এক্ষেত্রে অতিরিক্ত Melanin ত্বকের উপরের স্তর (Epidermis)-এ জমা হয়। ফলে দাগ সাধারণত স্পষ্ট বাদামী রঙের হয় এবং তুলনামূলকভাবে পরিষ্কারভাবে দেখা যায়।
বৈশিষ্ট্যঃ
- হালকা থেকে গাঢ় বাদামী রঙের দাগ
- সাধারণত দুই গাল, কপাল ও নাকের ওপর দেখা যায়
- চিকিৎসায় তুলনামূলক ভালো সাড়া দেয়
- নিয়মিত Sunscreen ও সঠিক স্কিন কেয়ারে উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি
২. ডার্মাল মেলাজমা (Dermal Melasma)
এই ধরনের মেছতায় Melanin ত্বকের গভীর স্তর ডার্মিস (Dermis)-এ চলে যায়।
ফলে দাগের রঙ কিছুটা ধূসর বা নীলচে-বাদামী দেখাতে পারে।
বৈশিষ্ট্য
- দাগ তুলনামূলক গভীর
- চিকিৎসায় সময় বেশি লাগে
- ধৈর্য ধরে দীর্ঘমেয়াদি যত্ন প্রয়োজন
- শুধুমাত্র বাহ্যিক স্কিন কেয়ার যথেষ্ট নাও হতে পারে
৩. মিক্সড মেলাজমা (Mixed Melasma)
এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়।
এক্ষেত্রে এপিডার্মাল (Epidermal) এবং ডার্মাল (Dermal) দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যই থাকে।
বৈশিষ্ট্য
- কিছু অংশ হালকা বাদামী
- কিছু অংশ গাঢ় বা ধূসর
- চিকিৎসার ফল ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে
- নিয়মিত ফলো-আপ ও সূর্য থেকে সুরক্ষা খুব গুরুত্বপূর্ণ
মেছতার সাধারণ লক্ষণ
অনেকেই প্রথম দিকে বুঝতে পারেন না যে এটি মেছতা নাকি সাধারণ Hyperpigmentation। নিচের লক্ষণগুলো থাকলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে পর্যবেক্ষণ করা উচিত।
- মুখে সমান ধরনের বাদামী বা ধূসর দাগ: সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো মুখের দুই পাশে সমানভাবে বাদামী বা ধূসর-বাদামী ছোপ তৈরি হওয়া।
- গালের ওপর দাগ: মেছতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় দুই গালে।
- কপালে দাগ: বিশেষ করে যাঁরা দীর্ঘ সময় রোদে থাকেন, তাঁদের কপালে Pigmentation বেশি হতে পারে।
- নাকের ওপর বা উপরের ঠোঁটে দাগ: এটিও Melasma-এর একটি পরিচিত বৈশিষ্ট্য।
- ধীরে ধীরে গাঢ় হওয়া: শুরুতে দাগ হালকা থাকলেও সময়ের সঙ্গে এবং রোদে গেলে এটি আরও গাঢ় হয়ে যেতে পারে।
- ব্যথা বা চুলকানি থাকে না: মেছতা সাধারণত ত্বকের রঙ পরিবর্তন করলেও অন্য কোনো শারীরিক অস্বস্তি সৃষ্টি করে না। তবে এটি অনেকের আত্মবিশ্বাস ও মানসিক স্বস্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
কারা মেছতার ঝুঁকিতে বেশি?
যদিও যে কারও মেছতা হতে পারে, কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
- নারীরা: পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে Melasma অনেক বেশি দেখা যায়। বিশেষ করে প্রজননক্ষম বয়সের নারীদের ক্ষেত্রে হরমোনের পরিবর্তন একটি বড় ভূমিকা রাখে।
- গর্ভবতী নারী: গর্ভাবস্থায় ইস্ট্রোজেন (Estrogen) ও প্রোজেস্টেরন (Progesterone)-এর মাত্রা পরিবর্তিত হয়। এই পরিবর্তনের ফলে অনেকের মুখে প্রথমবারের মতো মেছতা দেখা দিতে পারে। এজন্য মেছতা-কে অনেক সময় ” প্রেগন্যান্সি মাস্ক (Pregnancy Mask)”ও বলা হয়
- যাদের পরিবারে মেছতার ইতিহাস রয়েছে: যদি বাবা, মা বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে মেছতা থাকে, তাহলে আপনার ঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
- যারা নিয়মিত রোদে থাকেন: কৃষক, নির্মাণকর্মী, ট্রাফিক পুলিশ, ডেলিভারি কর্মী বা যাঁরা প্রতিদিন দীর্ঘ সময় বাইরে থাকেন, তাঁদের মধ্যে মেছতা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
- শ্যামলা বা মাঝারি গাঢ় ত্বকের মানুষ: বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ত্বকে মেলানিনের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। তাই মুখে মেছতা কেন হয়—এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ত্বকের স্বাভাবিক টোনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
- অনুপযুক্ত স্কিন কেয়ার: বারবার নতুন প্রোডাক্ট ব্যবহার, ত্বকে অতিরিক্ত ঘষাঘষি, অপ্রয়োজনীয় শক্তিশালী অ্যাকটিভ ব্যবহার বা স্কিন ব্যারিয়ার (Skin Barrier) ক্ষতিগ্রস্ত হলে পিগমেন্টেশন (Pigmentation) বেড়ে যেতে পারে।
মেছতা নাকি সাধারণ কালো দাগ (Hyperpigmentation)—কীভাবে বুঝবেন?
সব ধরনের পিগমেন্টেশন (Pigmentation) কিন্তু মেছতা নয়। অনেক সময় ব্রণের দাগ (Post-inflammatory Hyperpigmentation), রোদে পোড়া দাগ, বা অন্য ত্বকের সমস্যাকেও মানুষ মেছতা মনে করেন।
সাধারণভাবে যদি দাগ—
- দুই পাশে প্রায় সমানভাবে থাকে,
- ধীরে ধীরে বড় হয়,
- রোদে গেলে আরও গাঢ় হয়ে যায়,
- এবং দীর্ঘদিন ধরে একই জায়গায় থাকে,
তাহলে সেটি মেছতা হওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে। তবে নিশ্চিত হওয়ার জন্য বিশেষজ্ঞের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?
নিচের যেকোনো পরিস্থিতি হলে দেরি না করে একজন চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন—
- দাগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
- রঙ হঠাৎ খুব গাঢ় হয়ে গেছে।
- নতুন নতুন দাগ দেখা দিচ্ছে।
- দীর্ঘদিন যত্ন নেওয়ার পরও কোনো উন্নতি হচ্ছে না।
- দাগের সঙ্গে চুলকানি, ব্যথা বা অন্য অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা দিচ্ছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক কারণ শনাক্ত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রেই মেছতা নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।
মেছতা প্রতিরোধের উপায় ও মেছতা কমানোর জন্য দৈনন্দিন স্কিন কেয়ার
এখন আপনি জানেন মেছতা (Melasma) কী, কেন হয়, এর ধরন কী এবং কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। স্বাভাবিকভাবেই পরবর্তী প্রশ্ন আসে—মেছতা প্রতিরোধ করা কি সম্ভব?
এর উত্তর হলো, অনেক ক্ষেত্রেই হ্যাঁ।
যদিও সব ধরনের মেছতা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে সঠিক জীবনযাপন, সূর্য থেকে সুরক্ষা ও নিয়মিত স্কিন কেয়ার অনুসরণ করলে নতুন মেছতা হওয়ার ঝুঁকি কমানো এবং মেছতা আরও গাঢ় হওয়া প্রতিরোধ করা সম্ভব।
১. প্রতিদিন সানস্ক্রিন (Sunscreen) ব্যবহার করুন
যদি একটি মাত্র অভ্যাস পরিবর্তন করতে হয়, তাহলে সেটি হবে প্রতিদিন সানস্ক্রিন ব্যবহার করা।
অনেকেই মনে করেন শুধুমাত্র রোদে বের হলে সানস্ক্রিন লাগাতে হয়। বাস্তবে জানালার পাশের আলো, গাড়িতে ভ্রমণ বা অফিসে জানালার পাশে বসেও UV রশ্মির সংস্পর্শে আসা সম্ভব।
সানস্ক্রিন ব্যবহারের কিছু নিয়ম
- ব্রড স্পেকট্রাম সানস্ক্রিন (Broad Spectrum Sunscreen) ব্যবহার করুন।
- পর্যাপ্ত পরিমাণে মুখ, কান ও গলায় লাগান।
- দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে প্রতি ২–৩ ঘণ্টা পর পুনরায় ব্যবহার করুন।
- মেঘলা দিনেও সানস্ক্রিন ব্যবহার করা উচিত।
২. দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে চলুন
বাংলাদেশে সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে সূর্যের তাপ তুলনামূলক বেশি থাকে।
এই সময়ে দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকলে মেছতা আরও গাঢ় হতে পারে।
যদি বাইরে যেতেই হয়—
- ছাতা ব্যবহার করুন।
- প্রশস্ত টুপি পরুন।
- ইউভি প্রোটেকশন সানগ্লাস (UV Protection Sunglasses) ব্যবহার করুন।
- সম্ভব হলে ছায়াযুক্ত পথে চলুন।
৩. ত্বকের ধরন অনুযায়ী স্কিন কেয়ার করুন
অনেকেই অন্যের স্কিন কেয়ার রুটিন অনুসরণ করেন। কিন্তু সব ত্বক এক নয়।
একজনের জন্য কার্যকর কোনো পণ্য অন্যজনের ত্বকে জ্বালাপোড়া বা প্রদাহ তৈরি করতে পারে। আর ত্বকে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ (Inflammation) থাকলে পোস্ট-ইনফ্ল্যামেটরি হাইপারপিগমেন্টেশন (Post-inflammatory Hyperpigmentation) বা পিগমেন্টেশন (Pigmentation) বেড়ে যেতে পারে।
তাই—
- ত্বকের ধরন (Oily, Dry, Combination, Sensitive) বুঝে পণ্য নির্বাচন করুন।
- নতুন পণ্য ব্যবহারের আগে Patch Test করুন।
- অপ্রয়োজনীয়ভাবে একসাথে অনেক অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট (Active Ingredient) ব্যবহার করবেন না।
৪. ত্বকের সুরক্ষা স্তর (Skin Barrier) ঠিক রাখুন
স্কিন ব্যারিয়ার (Skin Barrier) ত্বককে বাইরের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
অতিরিক্ত স্ক্রাব, কেমিক্যাল প্রোডাক্ট বা বারবার ফেস ওয়াশ (Face Wash) ব্যবহার করলে স্কিন ব্যারিয়ার দুর্বল হতে পারে।
ফলে ত্বক আরও সংবেদনশীল হয়ে পিগমেন্টেশন বেড়ে যেতে পারে।
৫. হরমোনগত পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতন থাকুন
যদি গর্ভাবস্থা, জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল বা অন্য কোনো হরমোন থেরাপি (Hormonal Therapy) এর পর মুখে নতুন বাদামী দাগ দেখা যায়, তাহলে সেটিকে অবহেলা করবেন না।
নিজে থেকে ওষুধ ব্যবহার না করে একজন বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মেছতা কমাতে (Melasma Treatment Support) কোন উপাদানগুলো উপকারী হতে পারে?
সব উপাদান সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর নয়। তবে কিছু উপাদান হাইপারপিগমেন্টেশন (Hyperpigmentation) নিয়ে গবেষণায় ইতিবাচকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
- Licorice Extract (লিকোরিস এক্সট্র্যাক্ট)
- Vitamin C (ভিটামিন সি)
- Niacinamide (নিয়াসিনামাইড)
- Azelaic Acid (আজেলেইক অ্যাসিড)
- Kojic Acid (কোজিক অ্যাসিড)
- Tranexamic Acid (ট্রানেক্সামিক অ্যাসিড)
- Wild Turmeric (কস্তূরী হলুদ)
যেকোনো অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট (Active Ingredient) ব্যবহারের আগে নিজের ত্বকের অবস্থা ও সংবেদনশীলতা বিবেচনা করা জরুরি।
জীবনযাপনের যেসব অভ্যাস সাহায্য করতে পারে
যদিও কোনো নির্দিষ্ট খাবার একাই মেছতা দূর করতে পারে না, তবুও কিছু অভ্যাস ত্বকের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন। মেছতা কেন হয়?
- ফল ও সবজি সমৃদ্ধ সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- অতিরিক্ত মানসিক চাপ কমানোর চেষ্টা করুন।
- ধূমপান ও অতিরিক্ত অ্যালকোহল এড়িয়ে চলুন।
মেছতা নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা
- ভুল ধারণা ১: লেবু লাগালে মেছতা চলে যায়: লেবুর অম্লীয় উপাদান সংবেদনশীল ত্বকে জ্বালাপোড়া সৃষ্টি করতে পারে। এতে পিগমেন্টেশন (Pigmentation) আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
- ভুল ধারণা ২: একবার ভালো হলে আর ফিরে আসে না : মেছতা অনেক সময় নিয়ন্ত্রণে এলেও পুনরায় দেখা দিতে পারে, বিশেষ করে সূর্যের আলো ও হরমোনের প্রভাবে।
- ভুল ধারণা ৩: শুধু নারীদের হয়: পুরুষদেরও মেছতা হতে পারে, যদিও তুলনামূলক কম।
- ভুল ধারণা ৪: শুধুই রোদের কারণে হয়: রোদ একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলেও হরমোন, জেনেটিক্স, তাপ এবং কিছু ওষুধও ভূমিকা রাখতে পারে।
সারসংক্ষেপ
মেছতা কেন হয়—এর একক কোনো কারণ নেই। সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, হরমোনের পরিবর্তন, বংশগত বৈশিষ্ট্য, অতিরিক্ত তাপ এবং ত্বকের প্রদাহ একা বা একসঙ্গে মেছতার কারণ হতে পারে। তবে সুখবর হলো, সঠিক স্কিন কেয়ার, নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহার, সূর্য থেকে সুরক্ষা এবং প্রয়োজনে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিলে অনেক ক্ষেত্রেই মেছতা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। মুখে দীর্ঘদিন ধরে বাদামী বা ধূসর দাগ থাকলে নিজে থেকে চিকিৎসা না করে সঠিক কারণ নির্ণয় করে যত্ন নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায়।
মেছতা সম্পর্কে কিছু সাধারন জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. মেছতা কেন হয়?
মেছতা সাধারণত সূর্যের UV রশ্মি, হরমোনের পরিবর্তন, বংশগত কারণ, অতিরিক্ত তাপ এবং ত্বকে অতিরিক্ত মেলানিন উৎপাদনের কারণে হয়।
২. মেছতা কি সম্পূর্ণ ভালো হয়?
অনেক ক্ষেত্রে মেছতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও এটি পুনরায় ফিরে আসতে পারে। তাই নিয়মিত স্কিন কেয়ার ও সানস্ক্রিন ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ।
৩. পুরুষদের কি মেছতা হয়?
হ্যাঁ। যদিও নারীদের তুলনায় কম, তবে পুরুষদেরও মেছতা হতে পারে।
৪. গর্ভাবস্থায় মেছতা কেন হয়?
গর্ভাবস্থায় Estrogen ও Progesterone হরমোনের পরিবর্তনের কারণে মেলানিন উৎপাদন বেড়ে যায়, যা মেছতার ঝুঁকি বাড়ায়।
৫. রোদে গেলে কি মেছতা বাড়ে?
হ্যাঁ। সূর্যের অতিবেগুনি (UV) রশ্মি মেছতাকে আরও গাঢ় করতে পারে এবং নতুন দাগও তৈরি করতে পারে।
৬. মেছতা কি ছোঁয়াচে?
না। মেছতা কোনো সংক্রামক বা ছোঁয়াচে রোগ নয়।
৭. মেছতা কমাতে সানস্ক্রিন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত Broad Spectrum Sunscreen ব্যবহার করলে নতুন দাগ হওয়ার ঝুঁকি কমে এবং বিদ্যমান মেছতা আরও গাঢ় হওয়া প্রতিরোধে সাহায্য করে।
৮. মুখে কালো দাগ আর মেছতার মধ্যে পার্থক্য কী?
সব কালো দাগই মেছতা নয়। ব্রণের দাগ (Post-inflammatory Hyperpigmentation), রোদে পোড়া দাগ বা অন্যান্য পিগমেন্টেশনও মুখে কালো দাগ তৈরি করতে পারে। মেছতা সাধারণত মুখের দুই পাশে সমানভাবে দেখা যায় এবং রোদে গেলে আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।

